হারিয়ে যাওয়া বাংলা সিনেমার চটি বই

সমরেন্দ্র দাস

কালের নিয়মে অনেক কিছুই জীবন থেকে হারিয়ে যায়। হয়তো কোনও কোনও মানুষ তার জন্য হাহুতাশ করে, বাকিরা থাকে চুপচাপ। কিন্তু পুরনো মূল্যবোধে যারা বিশ্বাসী তাদের মন মাঝেমধ্যেই উদাস হওয়া খুব স্বাভাবিক। এখনও টলিউডে বাংলা ছবি তৈরি হয়। সেসব ছবির মধ্যে অনেকগুলিরই বাজেট বেশ আকাশছোঁয়া। কিন্তু বাংলা ছবি নিয়ে চটি বই এখন আর বের হয় না। সিনেমা হলে ঢোকার সময় গেটে এবং হলের মধ্যে বিক্রি হত এসব সুদৃশ্য সিনেমার বই।

সিনেমার এসব ছোট বুকলেট বা পুস্তিকা প্রকাশের কাজে যুক্ত থেকেছেন বহু শিল্পী। ঋত্বিককুমার ঘটকের ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ বা ‘সুবর্ণরেখা’-র ছোট পুস্তিকায় শিল্পী খালেদ চৌধুরীর অসামান্য কাজ মনে পড়ে। তিনি ছাড়াও ওসি গাঙ্গুলি, রণেনআয়ন দত্ত, শৈল চক্রবর্তী, অরূপ গুহঠাকুরতা, রেবতীভূষণ, পূর্ণেন্দু পত্রীর অপরূপ কাজ যারা দেখেছেন তারা কখনও সেসব ভুলবেন কী করে! এছাড়া সত্যজিৎ রায় তো ছিলেনই। তাঁর করা চলচ্চিত্রের সেইসব মালুম হবে সিনেমা পুস্তিকাগুলিতে চোখ বোলালে।

‘নায়ক’ সিনেমার শিরোনামে ‘য়’-এর ফুটকির জায়গায় * কিংবা ‘চিড়িয়াখানা’য় ‘খ’-এর নীচে রিভলবারে ‘ু’-এর বদলে ড্রইং এবং ‘না’-এর স্থলে ‘ন’টি শুধুমাত্র লাল রঙে ছাপা হওয়ার দরুন ‘খুন’ কথাটি কী অসামান্য কৌশলে বুদ্ধিদীপ্ত প্রয়োগ কার না ভালো লাগবে? আবার রণেনআয়ন দত্ত কৃত তপন সিংহ পরিচালিত ‘কাবুলিওয়ালা’ ও ‘অতিথি’-র সেই চটি বইয়ের কথাও নিশ্চয়ই কারও কারও চোখের সামনে ভেসে উঠবেই। অসাধারণ কাজ! রাজেন তরফদার পরিচালিত ‘গঙ্গা’, ‘পালঙ্ক’ সিনেমার বইকে রূপায়িত করেছিলেন ওসি গাঙ্গুলি।

পূর্ণেন্দু পত্রী ‘আপনজন’ ছায়াছবির বিজ্ঞাপনে যে ক্যালিগ্রাফিতে কবিতা দিয়ে বিজ্ঞাপন করেছিলেন তা তো শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত। পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘স্বপ্ন নিয়ে’, ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘মালঞ্চ’ চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনে যে শিল্পসুষমা প্রয়োগ করেছিলেন তা কি আমরা ভুলে যেতে পারি? এ সব কাজে আরও এক শিল্পীর নাম যুক্ত করা উচিত, তিনি বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। তিনিও সিনেমার পোস্টার, ব্যানার ডিজাইন করেছেন যথেষ্ট মুন্সিয়ানার সঙ্গে।

এসব চটি বইয়ের মূল্য ছিল এক সময়ে মাত্র দু আনা এখনকার হিসেবে ১২ পয়সা। সেটা অবশ্য পরবর্তী সময়ে বেড়ে ৩ টাকা পর্যন্ত হয়েছিল। এসব বইতে সিনেমার গল্পাংশ-র সঙ্গে বিভিন্ন নায়ক-নায়িকা ও চরিত্রাভিনেতার ছবি থাকত। থাকত পরিচালক, সহপরিচালক, সংগীত পরিচালক, আর্ট ডিরেক্টর প্রভৃতির নাম। আর থাকত সেই ছবির গান।

শোনা যায় যাদের সংগ্রহে এসব অমূল্য সম্পদ আছে তারা এগুলি বিক্রি করতে চাইলে এক একটা পুস্তিকার দাম পড়বে ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। আবার সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিককুমার ঘটক, তপন সিংহ, অসিত সেন, মৃণাল সেনের কোনও বুকলেট বা পুস্তিকার দাম নাকি ২০০০ টাকাও দিতে রাজি আছেন সংগ্রাহকরা। আজ সিনেমা হলের সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে, সিনেমার চটি বইয়ের যুগ তো কবেই শেষ হয়ে গিয়েছে। পড়ে আছে শুধু সেইসব ইতিহাসের মায়াকাজল– নস্ট্যালজিয়া!

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles