বেঙ্গল কালচার : হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হলের কথা

সমরেন্দ্র দাস

পাঁচ, ছয়, সাতের দশকে ছিল বাংলা সিনেমার রমরমা অবস্থা। আজকের মতো তখন তো এত দৈনিক পত্রিকা বেরুত না। আনন্দবাজার, যুগান্তর আর বসুমতীর মতো খবরের কাগজেই মানুষের মন সন্তুষ্ট ছিল। ছিল না এখনকার মতো এত নিউজ বা ওয়েব পোর্টাল। কিন্তু তারই মধ্যে এক এক সিনেমাকে ঘিরে হাইপ উঠত তুমুল। পাড়ার মা-কাকিমা-বউদিদের দুপুরের আড্ডায় সেসব কথা উঠে আসত তার ছিটেফোটা তো আমাদের কানেও পৌঁছত। আরও একটা জায়গা থেকেও বাংলা সিনেমার হালফিলের সংবাদ আসত। আর সেটা হল পাড়ার বেকারদের চায়ের দোকানের আড্ডা। সেইসঙ্গে কারও বাড়িতে গেলে ‘উল্টোরথ’-‘সিনেমা জগৎ’-‘ঘরোয়া’-‘প্রসাদ’-‘নবকল্লোল’ প্রভৃতি পত্রিকায় পাওয়া যেত বাংলা সিনেমার বহু মুখরোচক খবরাখবর কিংবা আসন্ন সিনেমার গল্পাংশ। সঙ্গে সেই চলচ্চিত্রের নানান ছবি।

তখনও পরিচালক অনুযায়ী সিনেমার খোঁজ রাখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি আমরা। পাড়ায় পাড়ায় অবশ্য সিনেমার পোস্টার পড়ত। সেসময় অভিনেতা-অভিনেত্রীর নামেই চিহ্নিত হত বাংলা ছায়াছবি। এখনকার মতো হাতে গোনা নায়ক-নায়িকা কিংবা পরিচালকও ছিল না। যাদের ওপর সাধারণ মানুষের আগ্রহ ছিল বেশি মাত্রায়। তখন উত্তমকুমার, বিকাশ রায়, অসিতবরণ, নির্মলকুমার, সৌমিত্র, বিশ্বজিৎ, সুচিত্রা সেন, সুমিত্রা দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, অরুন্ধতী দেবী, মালা সিনহা, মাধবী মুখোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া দেবী, সন্ধ্যা রায়… কতসব নামী-দামি অ্যাক্টর!

ইন্দিরা

দর্শকরা বাংলা ‘ছবি’ দেখতে ভিড় জমাতেন দক্ষিণ থেকে উত্তর কলকাতার হরেক সিনেমা হলে। ছায়াছবি মুক্তি পেত যেসব হলে তাদের চেন বলত। যেমন শ্রী-প্রাচী-ইন্দিরা, উত্তরা-পূরবী-উজ্জ্বলা প্রভৃতি। সিঙ্গল স্ক্রিনের ছড়াছড়ি তখন কলকাতা ছাড়াও গ্রাম বাংলার গ্রামেগঞ্জে! সকাল আটটা থেকে সিনেমা হলে টিকিট কাউন্টার খুলে যেত। একটা কাউন্টারে কারেন্ট অর্থাৎ সেই দিনের শো-এর টিকিট বিক্রি আর অন্যটায় লাইন পড়ত অ্যাডভান্স টিকিটের জন্য। সব চাইতে কম দামের টিকিট সাড়ে দশ আনা বা ৬৫ পয়সার টিকিটের জন্য লাইন পড়ত শো শুরু হওয়ার তিন চার ঘণ্টা আগে থেকে সাধারণত।

প্রাচী

দক্ষিণ কলকাতার যদুবাবুর বাজারের কাছে ‘রূপালী’ থেকে কালীঘাটের ‘উজ্জ্বলা’ পর্যন্ত আটটা সিনেমা হল ছিল। সিনেমা হলগুলির নাম ছিল যথাক্রমে ‘রূপালী’, ‘পূর্ণ’, ‘ভারতী’, ‘বিজলী’, ‘ইন্দিরা’, ‘বসুশ্রী’, ‘কালিকা’ এবং ‘উজ্জ্বলা’। তার মধ্যে রূপালী, কালিকা আর উজ্জ্বলা সিনেমা হল ভেঙে নতুন বিল্ডিং উঠেছে। ভারতী সিনেমা হলও ভাঙা পড়েছে। পূর্ণ সিনেমা হলে বহু দিন হল প্রদর্শনী বন্ধ। দক্ষিণে টিকে আছে ইন্দিরা, বিজলি ও বসুশ্রী। একে একে নিভেছে দেউটি। এইসব সিনেমা হলের মধ্যে রূপালী, কালিকা এবং বসুশ্রীতে চলত হিন্দি সিনেমা, বাদবাকি হলগুলিতে বাংলা ছবি। অবশ্য কখনও সখনও বসুশ্রীতে বাংলা ছবিও চলেছে।

পূর্ণ

দক্ষিণ কলকাতার মতো উত্তর কলকাতায় হাতিবাগান থেকে শ্যামবাজারের কিছু আগে পর্যন্ত অনেকগুলি সিনেমা হল ছিল। ‘রাধা’, ‘মিনার’, ‘চিত্রা’, ‘দর্পণা’, ‘শ্রী’, ‘উত্তরা’ প্রভৃতি। অবশ্য ‘মেট্রো’, ‘লাইট হাউস’, ‘নিউ এম্পায়ার’, ‘এলিট’ সিনেমা হলেও কিছু বাংলা ছবি মুক্তি পেয়েছিল।

মিনার সিনেমা

১৯৫৬ সালে দেবকীকুমার বসু পরিচালিত ‘চিরকুমার সভা’ রিলিজ করে নিউ এম্পায়ারে। ১৯৫৭ সালে কার্তিক চট্টোপাধ্যায়ের হিট ছবি ‘চন্দ্রনাথ’-এ অভিনয় করেন উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেন। আর এ ছবি মুক্তি পেয়েছিল মেট্রো সিনেমায়। ১৯৫৮ সালে মঙ্গল চক্রবর্তী পরিচালিত ও উত্তমকুমার-অরুন্ধতী দেবী অভিনীত ‘শিকার’ ছায়াছবি রিলিজ করে এলিট সিনেমা হলে।

এলিট

মাঝে-সাঝে দু’-তিন জন বন্ধু সব ক’টি সিনেমা হলেই ঢুঁ মারতাম। চলতি সিনেমার ফোটোগ্রাফ এবং কাট আউট শোভিত সিনেমার শোকার্ড দেখতাম। সেইসঙ্গে লক্ষ করতাম আগামী ছায়াছবির ফোটোগ্রাফগুলি। আবার যখন কোনও ছবি রিলিজ করত তার দু’-তিনদিন আগে সিনেমা হলের গায়ে টাইলস-এর ওপর যখন ফোটোগ্রাফ দেখে কোনও শিল্পী তেলরঙে ছবি আঁকতেন তখন এক ঘণ্টা-দু’ ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে দেখতাম কেমন সুন্দরভাবে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ছবি ফুটে উঠেছে।

নিউ এম্পায়ার

আবার শুক্রবারে যখন কোনও সিনেমা রিলিজ করত সেইসময় প্রেক্ষাগৃহ নানাভাবে সুসজ্জিত হত তা দেখতে বেশ ভালো লাগত, মজাও লাগত। বেশ মনে আছে রাজ কাপুরের ‘একদিন রাত্রে’ ছবিটি চলেছিল ইন্দিরা সিনেমা হলে এবং রজত জয়ন্তী সপ্তাহে একদিন রাত্রে কথাকটি বেলুন প্রিন্ট করে ঝোলানো হয়েছিল চতুর্দিকে। বহু বিখ্যাত পরিচালকের ছবি ইন্দিরা হলে মুক্তি পায়। সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’, ‘কাপুরুষ-মহাপুরুষ’, ‘চারুলতা’, ‘নায়ক’, মৃণাল সেনের ‘অবশেষে’, ‘পুনশ্চ’, ‘আকাশকুসুম’, ‘কোরাস’ বা অসিত সেনের ‘স্বরলিপি’, তরুণ মজুমদারের ‘বালিকা বধূ’ এই হলে মুক্তিলাভ করে।

ভারতী

তপন সিংহের বহু ছবি রিলিজ করেছিল ভারতী সিনেমা হলে। তবে সব চাইতে বেশি চমকপ্রদ ব্যাপার দেখেছিলাম ঋত্বিক ঘটকের ‘অযান্ত্রিক’ ছবিটি ঘিরে। হাজরা মোড়ের কাছে বসুশ্রী সিনেমার গাড়ি বারান্দার ওপরে একটা শেভ্রলে গাড়ি একজিবিট হয়েছিল। গাড়িটি ছিল ১৯২০ মডেলের। আসলে এ চলচ্চিত্রে জগদ্দল-এর ভূমিকায় ছিল ওই গাড়িটি আর এ ছবির প্রচার পরিকল্পনায় ছিলেন শিল্পী খালেদ চৌধুরী!

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles