হারিয়ে যাওয়া সন্ধ্যাতারা মিস শেফালি

সমরেন্দ্র দাস

যৌনতা নিয়ে বাঙালির ছুৎমার্গ কে না জানে! ভাবের ঘরে চুরি। লুকিয়ে-চুরিয়ে যা করা যায় সামনাসামনি তা করতে যে বোল্ডনেস দরকার তা থেকে শতহস্ত দূরেই থাকতে অভ্যস্ত ছিল বহুকাল বঙ্গসমাজ। কিন্তু যখন ফারপোজে মিস শেফালি ওয়েস্টার্ন ব্লুজ, সাম্বা কিংবা হাওয়াইয়ানের আবেগ, আবেশ আর মাদকতা ছড়িয়ে দিলেন। নড়েচড়ে উঠতে বোধহয় বাধ্য হলেন বাঙালি। উচ্চশ্রেণির কসমোপলিটন কলকাতাবাসী যখন ভিড় জমাতে শুরু করলেন সেসব হোটেলে তখন টনক নড়ল মধ্যবর্তী বাঙালিদেরও। কে এই নারী? যার আগুন পারফরম্যান্স উন্মাদ করে তুলতে পারে মনুষ্যসমাজকে! তিনি কি শুধুই সেক্স সিম্বল? এক নবীনা নৃত্যশিল্পীর উৎকর্ষে ভরাট এবং দক্ষতাকে মাথা ঝুঁকিয়ে স্যালুট করতে বাধ্য হয়েছিলেন তারাই। কল্লোলিনী কলকাতার বুকে হিল্লোল তুললেন মিস শেফালি!

ভাবলে অবাক লাগে পূর্ব পাকিস্তানের নারায়ণগঞ্জের এক নিম্নবিত্ত উদ্বাস্তু পরিবারের মেয়ে জীবিকার টানে এসে পড়লেন উত্তর কলকাতার আহিরীটোলায়। জীবন চালাতে গেলে জীবিকার প্রয়োজন। কলকাতার প্রাণকেন্দ্র চাঁদনিচকে এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ফ্যামিলিতে পেলেন এক নগণ্য পরিচারিকার কাজ। তাই সই! জীবনসাগরে ভেসে থাকতে গেলে এটাই বা কম কিসে? সাহস ছিল, ধৈর্যও ছিল সেই মেয়ের। নাচগানের পার্টি লেগেই থাকত সেই বাড়িতে। আড়ালে থেকে তা দেখেই বোধহয় নাচের তালিম নেওয়ার শুরুয়াত। তারপর ধীরে ধীরে শেফালির আত্মপ্রকাশ। তার আগে তাঁর নাম ছিল আরতি দাস।

একে একে ফারপোজ থেকে ওবেরয় গ্র্যান্ড, মোকাম্বো, ট্রিঙ্কাজ অথবা ব্লু ফক্সে মাতোয়ারা সকলেই শেফালির দেহ-সৌরভে, নৃত্য কুশলতায়। টুকটাক চলনসই ইংরেজিও ততদিনে করায়ত্ত শেফালির।

সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ চলচ্চিত্রে মিস শেফালি

সত্যজিৎ রায় যখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্রতী, তখন দরকার পড়ল ছবিতে দেহোপজীবিনী তথা নার্স এমন একজন অভিনেত্রীর। টালিগঞ্জের কোন অভিনেত্রী এগিয়ে আসবেন এমন চরিত্রে অভিনয় করতে? তখনও যে যৌনতা নিয়ে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। স্বয়ং পরিচালক সত্যজিৎ রায়েরও চিন্তা ছিল যথেষ্ট বই কী! মজার কথা সেই চরিত্রে নির্বাচিত হয়েছিলেন সেক্স বম্ব শেফালি! আদর্শবান মেধাবী অথচ রাজনীতিমনস্ক নায়কের সারল্য ভাঙার অসামান্য এক দৃশ্য। এক টেক-এই ওকে হয়েছিল সেই শট! আরও ইন্টারেস্টিং কথা হল, বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর স্ক্রিনটেস্টও নাকি নেননি!

সত্যজিতের আরও এক ছবিতে তারপরেও ডাক পেয়েছিলেন মিস শেফালি। ছবির নাম ‘সীমাবদ্ধ’। লেখকের নাম শংকর। সেখানে শেফালি নিজস্ব ভূমিকাতেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। নায়ক বরুণ চন্দের মনে আছে শুটিং হয়েছিল ফারপোজের লিডোরুমে। শুটিং সারতে সারতে রাত থেকে ভোর।

শুধু তো সিনেমাই নয়! লাস্যময়ী নৃত্যশিল্পী হিসাবে, আকর্ষণীয় চেহারার জন্য ডাক এসেছিল মঞ্চ থেকেও। বিশ্বরূপা, সারকারিনা মঞ্চে দাপিয়ে অভিনয় করেছেন পূর্ব পাকিস্তানের সেই মেয়েটিই। ‘চৌরঙ্গী’, ‘আসামী হাজির’ নাটকে শুধুমাত্র শেফালিকে একবার চোখের দেখা দেখতে নাটকের টিকিট তখন ব্ল্যাকে কাটতেও দ্বিধা করেনি বাঙালি দর্শক। সুদূর মফসসল থেকেও দলে দলে নানা মানুষ ভিড় জমাতেন রঙ্গমঞ্চে। খবরের কাগজে, বেতারে তাঁর নামটি সাড়ম্বরে ঘোষণাও করা হত সেইসময়ে।

তখন তাঁর অ্যাডমায়ারের সংখ্যা খুব একটা কম ছিল না। খোদ উত্তমকুমার বহুবার তাঁর নাচ দেখতে হাজির হতেন সুপ্রিয়া দেবীকে নিয়ে। উত্তমকুমারের ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতেও তাঁর নিমন্ত্রণ থাকত। দু’জনের সম্পর্ক ছিল ভ্রাতা-ভগ্নীর।

সত্তরের সেই যৌবনোচ্ছল নৃত্যশিল্পী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সোদপুরের নাটাগড়ের বাড়িতে প্রয়াত হলেন ৬ ফেব্রুয়ারি। বয়স হয়েছিল ৭৪। কিন্তু যাঁকে নিয়ে এত উন্মাদনা ছিল তুঙ্গে শববাহী গাড়ি যখন পানিহাটি শ্মশান চত্বরে ঢোকে তখন নেহাত আত্মীয়স্বজন ছাড়া ছিলেন মাত্র কয়েকজন প্রতিবেশী!

ছবি ঋণ : ইন্টারনেটের সৌজন্যে

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles