বেঙ্গল কালচার : এলো যে শীতের বেলা

সমরেন্দ্র দাস

রাজ্যে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে অবশেষে শীতের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। রবিববার ২০ তারিখে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২.৫ ডিগ্রি। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যাচ্ছে, আগামী তিন দিনে তাপমাত্রা নাকি আরও কমবে। এই মুহূর্তে আমলকির ডালে শীতের হাও়য়ার নাচন দেখতে পাচ্ছে মানুষ। ময়দানে কলকাতাবাসীরা সপরিবারে ভিড় জমাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে থাকছে খেলাধূলারও ব্যবস্থা। তারামণ্ডল ও চিড়িয়াখানায় টিকিটের লাইন দীর্ঘতর হচ্ছে।

করোনা আবহে এতগুলো মাস মানুষ ঘরবন্দি ছিল। লকডাউন উঠে গিয়ে এখন আনলকের পালা চলছে। লোকাল ট্রেন, মেট্রো, বাস, ট্রাম প্রভৃতি যানবাহন স্বাভাবিক হওয়ায় মানুষ হাঁপ ছেড়ে বের হতে শুরু করেছে।

এই ডিসেম্বরের শেষ দিকে বড়দিন এবং নিউ ইয়ার্স ডে পালনের হাতছানি দিচ্ছে শহরবাসীকে। পার্ক স্ট্রিট, সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল এবং মোহরকুঞ্জে সাজো সাজো রব। মহানগর সেজে উঠছে রঙিন আলোকমালা, ক্রি সমাস ট্রি আর সান্টা ক্লজের হাসিমাখা মুখে।

আগে শীতকালে সিঁথির মোড়, টালা, পার্ক সার্কাস, পাটুলিতে বসত রঙিন সার্কাসের তাঁবু। আর কে না জানে বাড়ির অভিভাবকের হাত ধরে কচিকাঁচারা ছুটত সেইসব তাঁবুর দিকে। সার্কাস মানেই তো নানান ধরনের খেলার কসরত। সেই সঙ্গে জোকারদের মজাদার সব পারফরম্যান্স।

শুধুই কি সার্কাস? শীতকাল মানেই তো পিকনিকের আনন্দে সামিল হওয়া। বাড়ির পিকনিক, পাড়ার পিকনিক, ক্লাবের পিকনিক, অফিসের পিকনিকে মোটর গাড়ি বা বাসে করে কাছেপিঠে ঘুরে আসা। শীতের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে পাউরুটি-ডিমসেদ্ধ আর কমলালেবু দিয়ে ব্রেকফাস্ট। সারাদিন শুধু মজা আর হইহুল্লোড়। দুপুরে মাংস ভাত-চাটনি-মিষ্টি খাওয়ার পর সবাই মিলে কিছু না কিছু খেলার অংশীদার হওয়া।

শীতকাল মানে আরও এক উৎসব। তখনই বসত বিভিন্ন জায়গায় মার্গসংগীতের আসর। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিখ্যাত শিল্পীরা আসতেন জলসার জৌলুস বাড়াতে। শুধু তো গান নয়, সেখানে নৃত্যও থাকত। তানসেন সংগীত সম্মেলন, সুরদাস সংগীত সম্মেলেনর জন্য মানুষজন অপেক্ষা করতেন– শীতকাল কবে আসবে? ইদানীং রবীন্দ্র সদনে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বসে মার্গসংগীতের আসর। নজরুল মঞ্চে বিশাল ভাবে ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়। আগে এই সব মার্গসংগীতের অনুষ্ঠান হত ইন্দিরা সিনেমা, মহাজাতি সদন প্রভৃতি হলে।

কলকাতায় এ বছর করোনা আবহ সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। মনে রাখা দরকার বিভিন্ন সার্কাসের বহু কর্মী দীর্ঘদিন বেকার। উপার্জন বলতে কিছুই নেই। প্রত্যেক বছর শীতে অজন্তা, অলিম্পিক, ফেমাস সার্কাসের তাঁবু পড়ত কলকাতার নানা জায়গায়। এ বছর সেই সব সার্কাসের কোনওই তাঁবু পড়েনি। এমনিতেই পশু-পাখিদের নিয়ে খেলা নিষিদ্ধ হওয়ার পর সার্কাসের জৌলুস কমে গেছে। বিদেশি শিল্পীদের জিমন্যাস্টিক ও ট্রাপিজিয়ামের খেলাই এখন যেকোনও সার্কাসের মুখ্য আকর্ষণ। কয়েকটি সার্কাস দল এ বছরও খেলা দেখানোর জন্য আবেদন করেছিল অনুমতি চেয়ে পুরসভার কাছে। কিন্তু ভয়াবহ করোনার জন্য সে আবেদনে সাড়া মেলেনি সরকারি ভাবে।

শীতে আর এক আকর্ষণ নানা রকমের মেলার। এবার কলকাতার বইমেলা হবে কিনা এখনও পর্যন্ত জানা যাচ্ছে না। সবমিলিয়ে শীতের বেলা এলেও মানুষের অনেক মহামিলন মেলা হবে না মহানগরীতে।

তবে আসার কথা শীতকালে যেসব জায়গায় পুষ্প প্রদর্শনী হয়, সেগুলো এবারও হবে। বিধানসভার অঙ্গনে, হর্টিকালচার গ্রাউন্ডে, নিউটাউনে, হাওড়ার পাওয়ার হাউস সংলগ্ন মাঠে কিংবা দাসপুরে ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ, সূর্যমুখী, গাঁদা এবং রঙিন মরসুমি ফুলের দেখা মিলবে। সাধারণ মেলা মানেই বহু মানুষের ভিড় বলে রাজ্য সরকার অনেক মেলার ক্ষেত্রেই ছাড়পত্র দেয়নি। তবে ফুলের মেলাতে অত ভিড় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই হয়। সেখানে শুধু বিশেষ ধরনের মানুষেরই যাতায়াত। আর মানুষ সেই মেলায় গিয়ে একটা আনন্দের আমেজ নিতে পারবেন তো নিশ্চই!

ছবি ঋণ : ইন্টারনেটের সৌজন্য

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles