বাইরে-দূরে : কুমায়ুনের পাহাড়ে ঘেরা চৌকরি-মুন্সিয়ারি-ঝালতোলা/২

সমরেন্দ্র দাস

 

মুন্সিয়ারি

ট্যুরিস্টদের কাছে ‘বিরথি’ এখন এক প্রিয় নাম। চৌকরি থেকে মুন্সিয়ারির দূরত্ব ৯৮ কিলোমিটার। চৌকরি থেকে মুন্সিয়ারি যাওয়ার পথে পড়বে থল, তেজাম, বিরথি আর কালামুনি টপ। বিরথি গ্রাম ছেড়ে খানিক দূরে সড়কপথের বাঁদিকে পায়ে চলা পথে পৌঁছানো যাবে বিরথি জলপ্রপাতের কাছে। একইসঙ্গে অনেকগুলি ঝরনা প্রায় ৪০০ ফুট ওপর থেকে জলপ্রপাতের ধারায় নীচে পড়ছে। কাছেই রয়েছে কুমায়ুন মন্ডল বিকাশ নিগমের সর্বাধুনিক ট্যুরিস্ট রেস্টহাউস। যারা প্রকৃতিকে নিবিড় করে পেতে চান এবং নির্জনতাবিলাসী তাদের জন্য একেবারে আদর্শ জায়গা। তার কারণ রেস্টহাউস ছাড়া কাছেপিঠে তেমন কোনও ঘরবাড়ি নেই। প্রকৃতিপাঠের জন্য এক বড় উপভোগ্য জায়গা।

মুন্সিয়ারি যাওয়ার পথে বিরথি পার হলেই চড়াইপথ ঘুরে ঘুরে উঠে গিয়েছে পাহাড়ের একেবারে শীর্ষদেশে। চর্তুদিকে শুধু দেওদার আর পাইনের হাতছানি। কালামুনি টপের উচ্চতা ৯৭০০ ফুট। সাধুসন্তদের আখড়া দেখতে পাবেন সেখানে। আর আছে কালীমন্দির। এখান থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে মুন্সিয়ারি। পিথোরাগড় জেলার অন্যতম মহকুমা শহর এটি।

আসলে মুন্সিয়ারি পৌঁছানো মানে হল পঞ্চচুল্লির পর্বতমালার প্রায় পায়ের কাছে চলে যাওয়া। পর্যটকদের এজন্য মুন্সিয়ারি নিয়ে এত উৎসাহ। এক সময়ে ভারত ও তিব্বতের বাণিজ্যপথের কেন্দ্র ছিল এটি। পাহাড়ের ঢালে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, হোটেল- রিসর্ট এবং অবশ্যই ঘরবাড়ি। প্রায় ৭৩০০ ফুট উঁচু মুন্সিয়ারি শহরজুড়েই ভিউ পয়েন্ট। কোনটা ছেড়ে কোনটা ধরব — এমন ভাবনার শরিক হতে হয় পর্যটকদের। এখান থেকে হংসলিক, রাজরম্ভা, চিপলাকোট এবং পঞ্চচুল্লির অসামান্য রূপের ছটা ও তাদের ঘনঘন পট পরিবর্তন যে- কোনও মানুষকে মুগ্ধ করে।

যারা ট্রেকিং করতে ভালোবাসেন তাদের কাছে এ যেন এক স্বর্গভূমি। নানান ট্রেকপথের ভিতর একটি চলে গিয়েছে মিলাম হিমবাহের দরজা পর্যন্ত। দু-দুটি ট্রেকপথ গিয়েছে নাসিক ও রালাম হিমবাহের দিকে। আর একটি ট্রেকপথ গিয়েছে খালিয়া বুগিয়ালের দিকে। যারা ছোট ট্রেক করে পাহাড়ি পথের আনন্দ উপভোগ করতে চান তারা ঘুরে আসতে পারেন থামরিকুণ্ড থেকে। কালামুনি টপের সড়কপথে মাত্র আড়াই কিলোমিটার এগোলেই পৌঁছনো যাবে থামরিকুণ্ডে।

পর্যটকদের কাছে সবচাইতে দর্শনীয় স্থান হল নন্দাদেবীর মন্দির। চড়াই- উৎরাই নেই– একেবারে সমতলে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছানো যাবে। এখান থেকে নীচের দিকে চোখ গেলেই দেখতে পাবেন বয়ে চলেছে গোরিগঙ্গা নদী। পর্যটকদের একেবারে যেন নাগালের মধ্যে পঞ্চচুল্লি এবং অন্যান্য পর্বতশিখর দেখার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পাওয়া যাবে।

শহরের প্রাণকেন্দ্র হল বাজার। সেখান থেকে কিছুটা দূরেই রয়েছে ট্রাইবাল হেরিটেজ মিউজিয়াম। এই সংগ্রহশালাটি গড়ে ওঠার পেছনে যাঁর অবদান তিনি হলেন প্রবীণ অধ্যাপক কোর সিং। তিনি মাস্টারজি নামেই পরিচিত। স্থানীয় অঞ্চলের উপজাতীয় জীবনযাপন ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত নানা দুর্লভ সম্ভার সংগ্রহ করে এ সংগ্রহশালাটি তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। সকাল ১০ টায় এই মিউজিয়ামটি খোলে, বন্ধ হয় বিকেল ৫টায়। প্রবেশমূল্য মাত্র ১০ টাকা। সংগ্রহশালায় রয়েছে কাঠ ও ধাতু নির্মিত বিভিন্ন ধরনের পাত্র, ভেড়ার লোম দিয়ে তৈরি রকমারি শীতবস্ত্র, তাঁতযন্ত্র, পোশাক আশাক, অলংকার দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র। এছাড়া দেখতে পাবেন হস্তশিল্পের কত নমুনা।

মুন্সিয়ারির আরও এক গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্যস্থান হল ‘সরস বাহার’ নামের বিক্রয়কেন্দ্রটি। এটি সারমোলি এলাকায়। বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর হরেক সামগ্রী আছে এখানে। শীতবস্ত্র এবং কার্পেট দেখে না কিনে পারা যায় না। কী অপরূপ রঙিন সম্ভার সব! এ ছাড়া কত ধরনের ডাল, রাজমা, এলাচ প্রভৃতিও কিনতে পাওয়া যায় এখানে।

থাকার জন্য মুন্সিয়ারি থেকে গাড়ি ভাড়া করে ২২ কিলোমিটার দূরে মদকোট এবং ১২ কিলোমিটার দূরে দারকোট। মদকোটের কাছেই রয়েছে একাধিক উষ্ণ প্রস্রবণ এবং একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। দারকোট বেশ পুরনো গ্রাম। গ্রামের বহু মানুষের ঘরবাড়িতে কাঠের কারুকাজ দেখে মুগ্ধ না হয়ে কোনও উপায় নেই।

মুন্সিয়ারিতে সরকারি ট্যুরিস্ট আবাস তো পাবেনই তাঁর সঙ্গে রিসর্ট ও হোটেলের অভাব নেই। তবে বাঙালি মাত্রই যেখানে থাকতে পছন্দ করেন তার নাম পান্ডে লজ। বাঙালির মনপসন্দ রান্না এখানে পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে ট্রেকিং করার জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্যও পাবেন এখানে।

 

ছবি ঋণ: ইন্টারনেট
[চলবে]

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles