বাইরে-দূরে : রঙিন ফুলের হাতছানি, টেরাকোটা মন্দির আর ঐতিহাসিক রাজবাড়ি

দেবস্মিতা

করোনার জন্য বেশ কয়েক মাস ধরে ঘরবন্দি অনেকেই। কিন্তু যাদের পায়ের তলায় সরষে তাদের করোনা আর কতদিন ভয় পাওয়াবে! তাই সেসবকে তুড়ি মেরে বেরিয়ে পড়লাম গ্রামবাংলার সৌন্দর্য দেখতে। আমাদের চারপাশে বহু জায়গা আছে যেগুলোর সন্ধান হয়তো অনেকেই জানে না। প্রথম গন্তব্য পূর্ব মেদিনীপুরের ক্ষীরাই। প্রথমেই চোখে পড়ল হরেকরকম ফুল। গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, মোরগঝুঁটি কী নেই। উপরি পাওনা হিসাবে মিলল সতেজ বাতাসের পাশাপাশি মানুষের সারল্যও।

আলাপচারিতায় জানা গেল করোনা থাবা বসিয়েছে তাদের রুটিরুজিতেও। দীর্ঘ লকডাউনে তাদের ব্যাবসাও যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত। ফুলের সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটিয়ে চললাম নস্করদিঘির উদ্দেশে। এই জায়গা এককথায় যেন পশ্চিমবঙ্গের গোলাপ বাগিচা। যেদিকে চোখ যায় শুধু গোলাপ আর গোলাপ। সেখান থেকে রওনা দিলাম পশ্চিম মেদিনীপুরের নাড়াজোল রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে।

নাড়াজোল রাজবাড়ি

ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘নাড়া’ শব্দটি এসেছে ধান কেটে রাখার পর তার অবশিষ্টাংশ থেকে। ‘জোল’ শব্দটি সম্ভবত জলার অপভ্রংশ। কয়েক শতাধিক বছর আগে শিলাবতী ও কংসাবতী নদীর মধ্যবর্তী জঙ্গলাকীর্ণ, জনবিরল এই অঞ্চলে জল নিকাশি ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়শই জলমগ্ন হয়ে পড়ত। সেই থেকেই এই অঞ্চলের এরূপ নামকরণ বলে অনুমান। প্রায় ৬০০ বছরের পুরনো এই রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা উদয়নারায়ণ ঘোষ, ইছাই ঘোষের (মঙ্গল কাব্যের) বংশধর ছিলেন বলে জানা যায়। বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী এই রাজবাড়ি। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ক্ষুদিরাম বসু, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ মনীষীদের পদধূলি পড়েছে এখানে।

নাড়াজোল রাজবাড়ির এই অংশে বিপ্লবীদের গোপন বৈঠক হত

স্বাধীনতা আন্দোলনে এই রাজপরিবার সরাসরি যুক্ত ছিল। রাজা নরেন্দ্রলাল মেদিনীপুর বোমা মামলাতে স্বয়ং গ্রেফতারও হয়েছিলেন। তিনি নিয়মিত অর্থ সাহায্য করতেন গুপ্ত সমিতিকে। অরবিন্দ ঘোষ, হেমচন্দ্র কানুনগো, বারীন ঘোষ প্রমুখ বিপ্লবীরা এখানে এসে নিয়মিত গোপন মিটিং করতেন। এই সময় ক্ষুদিরাম বসুর বাবা ত্রৈলোক্যনাথ বসু রাজবাড়ির তহশীলদার ছিলেন। রাজা নরেন্দ্রলালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দেবেন্দ্রলাল যুক্ত হয়েছিলেন বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর রাজা দেবেন্দ্রলালকে ভারত সরকার ‘দেশভক্ত’ সম্মান প্রদান করেন। বর্তমানে নাড়াজোল রাজবাড়ির জরাজীর্ণ অবস্থা। দেওয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ছে। আগে এখানে রাজ কলেজ ছিল, এখন দোতলাতে পুলিশ ক্যাম্প রয়েছে। বিরাট রাজভবনের পাশেই রয়েছে নাটমন্দির। মন্দিরের গায়ে চোখে পড়ল টেরাকোটার অলঙ্করণ। পার্শ্ববর্তী দালানের উপরের অংশে রয়েছে রঙিন কাচের নকশা যা দেখেই নাকি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের উপাসনালয় নির্মাণ করেছিলেন বলে প্রচলিত।

মন্দির-বাড়ির দরজায় কাঠের খোদাই করা নকশা দেখতে পাওয়া যায়। হারিয়ে যাওয়া কাঠের কাজের অপরূপ নিদর্শন। রাস্তার অপর পারে রয়েছে রাজবাড়ির ত্রিতল হাওয়ামহল, সামনেই বাঁধানো ঘাট। কাছেই রয়েছে ২৫ চুড়া বিশিষ্ট রাসমঞ্চ, ৬ টি শিবমন্দির প্রভৃতি। কালের নিয়মে রাজপরিবারের সেই জৌলুস না থাকলেও প্রাচীন এই স্থাপত্য স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পরাধীন ভারতের বৈপ্লবিক কর্মযজ্ঞের সাক্ষী হিসাবে।

দুঃখের বিষয়, এই স্থাপত্য একেবারেই ভগ্নপ্রাপ্ত। স্থানীয় মানুষজন জানালেন, বহুবার সরকারের কাছে আবেদন করা হলেও কোনওরকম সরকারি সাহায্য মেলেনি। হঠাৎ হুঁশ ফিরতেই দেখলাম সূর্য পাটে বসেছে। এবার ফেরার পালা। ভারাক্রান্ত মনে রওনা দিলাম কলকাতার উদ্দেশে।

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles