কলকাতার গর্বের গির্জা

সমরেন্দ্র দাস

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জোব চার্নক ভাগ্যের খোঁজে আহিরীটোলার কাছে জাহাজ ভেড়ান একসময়। সময়টা ছিল ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৪ অগস্ট। কলকাতা তখন ছিল যাকে বলে জলা-জঙ্গলে পরিপূর্ণ অজ গাঁ। জলা বলতে এঁদো ডোবা। জলের মধ্যে পাতা পড়ে পচে দুর্গন্ধ বাতাসকে ভারী করে তুলত। ডোবার পাড়ে ঘাপটি মেরে থাকত কুমির। শেয়াল, বিষাক্ত সাপখোপে ভরা সেই সময়ের কলকাতায় বাঘের ডাকও শোনা যেত রাত্রে। দিনেও ঝিঁঝি পোকার ডাক শুনতে পাওয়া যেত। মাঝে মাঝে রাতের বেলা ডাকাতে কালীমন্দির থেকে ভয়ংকর হা-রে-রে হুংকার ভেসে আসত। পথের মাঝে ডাকাতদের পাবড়ার ঘায়ে মানুষ লুটিয়ে পড়লে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হত টাকাপয়সা।

জোব চার্নক

এই ধরনের পরিবেশে মাটির দেওয়াল তুলে ওপরে গোলপাতার ছাউনি দেওয়া কয়েকটামাত্র ঘর তুলে ব্যাবসা জমানোর জন্য জোব চার্নক ঘাঁটি গাড়লেন। বাঙালিরা যেমন কোথাও থিতু হলে নিদেনপক্ষে একটা কালীবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন ধর্মকর্মের জন্য সেইরকম ইংরেজদের দরকার হয়ে পড়ল, ধর্মাচারণের জন্য একটি চার্চের। জোব চার্নক সেজন্য একটা গোলপাতায় ছাওয়া কুটিরকেই গির্জাঘর বানিয়ে নিলেন। আর সেটাই হল কলকাতার বুকে প্রথম গির্জা।

ক্যাথেড্রাল অফ দি মোস্ট হোলি রোজারি

কিছুকাল পরে জোব চার্নক মুরগিহাটায় একখণ্ড জমি প্রদান করেন পর্তুগিজ অগাস্টিয়ানদের। সেই জমিতে ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে তারা একটি অস্থায়ী গির্জাঘর গড়ে তোলে। ১৭০০-য় সেটি রূপান্তরিত হয় ইটের তৈরি ছোট একটি চ্যাপেলে। এখন বড়বাজার অঞ্চলে পর্তুগিজ চার্চ স্ট্রিটে ‘ক্যাথেড্রাল অফ দি মোস্ট হোলি রোজারি’ নামে সুদৃশ্য চার্চটি দেখা যায় তা ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে বিত্তশালী পর্তুগিজ ব্যবসায়ী ব্যারেটো ভাইদের অর্থানুকূল্যে গড়ে ওঠে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বর্তমানে ডালহাউসি এলাকায় তৈরি করে ১৬৯৬-এ কেল্লা। সেইসময়ের ইংল্যান্ডেশ্বর রাজা উইলিয়াম দি থার্ডের নামে কেল্লার নাম দেওয়া হল ফোর্ট উইলিয়াম। এখনকার জিপিও অর্থাৎ জেনারেল পোস্ট অফিস, কলকাতা কালক্টরেট, কাস্টমস হাউস আর ইস্টার্ন রেল-এর অফিস নিয়ে সেই কেল্লা ছিল। ফোর্ট উইলিয়ামের ভিতরের একটি ঘরকে গির্জাঘর হিসেবে ইংরেজরা ব্যবহার করতে শুরু করে। এইভাবেই গোলপাতায় ছাওয়া কুটির থেকে ইংরেজদের উপাসনা ঘর তখন স্থানান্তরিত হল একেবারে পাকা ঘরে।

এদিকে বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা ক্রমশ ফুলেফেঁপে ওঠার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কলকাতা শহরের চেহারা একটু একটু করে বদলাতে লাগল। ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির একটি সার্ভেতে দেখা গেল সেই সময়ে কলকাতার পাকাবাড়ির সংখ্যা মোট আট, মেটে বাড়ির সংখ্যা আট হাজার। মোট রাস্তা আর গলির সংখ্যা মাত্র দুটো। তখনও কলকাতা শহরে ইংরেজদের নিজস্ব কোনও উপাসনা অর্থাৎ গির্জা গড়ে ওঠেনি। সবকিছুই হই হই রই রই করে ইংরেজরা নতুন করে কলকাতাকে গড়ে তুলছে। চিনেবাজার থেকে হেস্টিংস অবধি সাহেবপাড়ার চাকচিক্য চোখে পড়ার মতো। কিন্তু মনে সুখ নেই একটা ব্যাপারে– ধর্মকর্মের জন্য নিজস্ব কোনও বড়সড় পাকাপাকি গির্জাঘর নেই। ফোর্ট উইলিয়ামের একটেরে ঘরে প্রার্থনার আসর বসে কোনও মতে। এমনকী একজন নির্দিষ্ট পাদরি পর্যন্ত নেই। প্রেয়ারের সময় কাউন্সিলের কোনও একজনকে পাদরি সাজানো হয়। তিনি কালো কোট পরে জ্ঞানগর্ভ সারমন দেন। অবস্থা এমন দাঁড়ায় একসময় যে সেই ছোট উপাসনা ঘরে স্থান সঙ্কুলান করাই মুশকিল। কারণ ততদিনে ইংরেজদের সংখ্যাও যে বেড়ে উঠেছে!

উপায় না দেখে ইংরেজরা গির্জা নির্মাণের জন্য চাঁদার খাতা খুলে ফেলল। হু হু করে চাঁদা জমা পড়তে লাগল দেদার। তারফলেই রাইটার্স বিল্ডিংয়ের পশ্চিমদিকে ১৭০৯ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হল সেন্ট অ্যানস গির্জা। ওই সালের পাঁচ জুন সেই চার্চের উদ্বোধন হয় জনসাধারণের জন্য। ইংল্যান্ড থেকে কোম্পানির ডিরেক্টররা ভারী সুন্দর এক ঘণ্টা পাঠালেন। পাদরিও এলেন সুদূর ইংল্যান্ড থেকে– তাঁর নাম উইলিয়াম অ্যান্ডারসন। সেটাই ছিল কলকাতার প্রথম ইংরেজদের চার্চ। ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে প্রবল ঝড়ে গির্জার চূড়াটি অবশ্য ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে। আর ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে সিরাজদৌল্লা কলকাতা জয় করে সেই চার্চটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন। কলকাতার নতুন নামকরণ করেন আলিনগর।

তারপর মুরগিহাটার পোর্তুগিজ চ্যাপেলকে ইংরেজরা প্যারিস চার্চ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। সেই চ্যাপেল পোর্তুগিজরা ফিরে পায় ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে। কারণ ততদিনে কোম্পানি কেল্লার মধ্যেই সেন্ট জনস চ্যাপেল গড়ে তুলেছে। যা ১৭৬০ থেকে ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইংরেজদের প্রেসিডেন্সি চ্যাপেল বা প্রধান উপাসনা কেন্দ্র।

আর্মেনিয়ান চার্চ

১৭২৪ সালে অবশ্য চিনেবাজারে নির্মিত হয়েছে আর্মেনিয়ান চার্চ। তবে কলকাতার বুকে যেসব গির্জা আছে তার মধ্যে অন্যতম হল সেন্ট জনস চার্চ। যে গির্জাটি নির্মিত হয় তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের সহায়তায়। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ এপ্রিল এই গির্জার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ওয়ারেন হেস্টিংস। আর ১৭৮৭ সালে এই গির্জা নির্মাণ সমাপ্ত হলে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

সেন্ট জনস চার্চ

সেই থেকে সেন্ট জনস চার্চ হয় কলকাতায় ইংরেজদের প্যারিস (Parish) চার্চ। আগে এই এলাকায় ছিল ইংরেজদের কবরখানা। কলকাতার অতি প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত কিছু ইংরেজদের সমাধি রয়েছে এই গির্জা প্রাঙ্গণে। যার মধ্যে জোব চার্নক, ডাক্তার হ্যামিলটন, অ্যাডমিরাল ওয়াটসন ও বেগম জনসনের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। গ্রিক স্থাপত্য প্রথায় তৈরি এ গির্জা। শুধু তাই নয় এটি হল কলকাতার প্রথম অ্যাংলিকান ক্যাথিড্রাল। শোভাবাজারের মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব এই জমি দান করেন কোম্পানিকে। আর সুদূর রাজমহল থেকে এই গির্জার পাথর আনা হয়েছিল। সেজন্য তখন একে বলা হত পাথুরে গির্জা।

কলকাতায় শিয়ালদহ অঞ্চলের বৈঠকখানায় ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে গড়ে তোলা হয় নতুন গির্জা– চার্চ অফ আওয়ার লেড়ি অফ ডলারস। গ্রেস এলিজাবেথ নামক এক ভারতীয় খ্রিশ্চান রমণী ও কয়েকজন পোর্তুগিজের উদ্যোগে এই চার্চ গড়ে ওঠে।

রাইটার্স বিল্ডিং-এর পূর্ব দিকে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম স্কটিশ চার্চ-এর নাম সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ। এখানে ছিল কোম্পানির মেয়রস কোর্ট। মহারাজ নন্দকুমারের বিচারসভা বসেছিল এখানেই।

সেন্ট জেমস চার্চ

পাঁচ বিঘে জমির উপর বৈঠকখানা অঞ্চলে সেন্ট জেমস চার্চটির ভিত্তি স্থাপন করা হয় ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে। তিন বছর পরের তার উদ্বোধন হয়। যদিও তার ২০ বছর পরে গির্জাটি ভেঙে যায়। পরবর্তী সময়ে ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে সার্কুলার রোডে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হল সেন্ট জেমস চার্চ। এই চার্চটি গথিক স্থাপত্যরীতিতে তৈরি। এই গির্জার দুটি একইরকম মিনার থাকায় নাম হয়ে গিয়েছে জোড়া গির্জা।

১৮৩০ সালে এখনকার মিডলটন রো-তে সেন্ট টমাস চার্চের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন লেডি উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক। ১৮৩১ সালে এই চার্চটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। মাদার টেরিজার পরলোক গমন হলে সপ্তাহব্যাপী এখানে তাঁর নশ্বর দেহ রাখা হয়েছিল সকলের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের উদ্দেশে।

সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল

কলকাতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজধানী হওয়ায় সেখানে ইংরেজদের বসবাস বেড়ে চলে। তখন সেন্ট জনস চার্চে এত ভিড় হতে শুরু করে যে ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা মনস্থ করে চৌরঙ্গিতে সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল নামে বেশ বড় উপাসনালয় তৈরি করা হবে। অসামান্য সুন্দর এই চার্চটি তৈরি করতে লেগেছিল সাত বছর। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ অক্টোবর এই গির্জার উদ্বোধন হয়। এত দীর্ঘ চূড়াবিশিষ্ট চার্চ কলকাতায় আর একটিও নেই।

তবে অনেক বাঙালির কাছে মিশন রো-র ওল্ড চার্চটি অনেক বেশি আবেগের। কারণ প্রাচীন প্রোসেস্টান্ট চার্চেই ব্যাপটাইজ করা হয় কবি মধুসূদন দত্তের ১৮৪৩-এর ৯ ফেব্রুয়ারি। নাম হয় মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে ক্যারোল

২৫ ডিসেম্বরে বড়দিনে কলকাতার নানান গির্জা এবারও বহু মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হবে। আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে ‘মেরি ক্রিসমাস’। সেই উপলক্ষে ক্যারোল শোনা যাবে গির্জায় গির্জায়। তবে করোনা আবহে পার্ক স্ট্রিটে মানুষজনের বড়দিন পালনে পুলিশ প্রশাসন অনেকগুলি বিধিনিষেধ এবার আরোপ করেছে। সে যাই হোক বড়দিনে মানুষের উৎসাহ-উন্মাদনায় মনে পড়বে বাঙালির ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’!

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles