স্বরাষ্ট্রসচিবের চিঠি ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা‘, কেন্দ্রকে চিঠি তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের

বীরেন ভট্টাচার্য, নয়াদিল্লি

জেপি নাড্ডার কনভয়ে হামলা এবং তার প্রেক্ষিতে রাজ্যপালের চিঠি পাঠানো ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তরফে রাজ্যের মুখ্যসচিব ও জিডিকে ডেকে পাঠানো নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত অব্যাহত চিঠি চালাচালিতে। শনিবার অমিত শাহের মন্ত্রকে চিঠি দিয়ে পুরো বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিলেন তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রকে লেখা চিঠিতে শ্রীরামপুরের সাংসদ উল্লেখ করেছেন, “আপনার দফতরের ডেপুটি সেক্রেটারির ১১ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে পাঠানো চিঠিতে আমরা বিস্ময় প্রকাশ করছি। সেই চিঠিতে ‘পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’ এবং জেড ক্যাটাগরির ব্যক্তির ওপর হামলা নিয়ে আলোচনার জন্য ১৪ ডিসেম্বর বেলা ১২.১৫ মিনিটে তাঁর দফতরে একটি বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশকে ডেকে পাঠানো হয়েছে।”

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে লেখা চিঠিতে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, “আমরা আপনাকে প্রথমেই জানিয়ে রাখি, ভারতের সংবিধানের ৭তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘রাজ্যের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে। কীভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য আপনি দুই আধিকারিককে ডেকে পাঠাতে পারেন?” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “ভারতের সংবিধান বা যে কোনও আইনের অধীনে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারেন কি? এটাতে মনে হচ্ছে, একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং আপনার মন্ত্রী, যিনি ভারতীয় জনতা পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য, তাঁর জন্য আপনি এই উল্লেখিত চিঠিটি ব্যবহার করেছেন।” কেন্দ্রীয় সরকারকে লেখা চিঠিতে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখ করেন, এটাতে মনে হচ্ছে যে, “আপনার দফতরে মুখ্যসচিব এবং ডিজিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ডেকে পাঠানোর বিষয়টি ক্ষমতার রং লাগানো হয়েছে অথবা মন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গে অশান্তি তৈরির জন্য আপনাকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে।” কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় চিঠিতে অভিযোগ করেন, “বিষয়টি যেভাবে আপনি দেখছেন, তাতে মনে হচ্ছে, যে আপনি সাংবিধানিক অধিকারের বাইরে গিয়ে কাজ করছেন।” পাশাপাশি তৃণমূল সাংসদ চিঠিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব অজয় ভাল্লাকে আরও জানান, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে, রাজ্য সরকার বিধানসভার প্রতি দায়বদ্ধ, আপনার বা আপনার মন্ত্রীর কাছে নয়। আপনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং উদ্দেশে কাজ করছেন। আপনার এই ধরনের কাজ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।”

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিবকে লেখা চিঠিতে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার জেপি নাড্ডার কনভয়ে হামলার ঘটনা নিয়ে কী পদক্ষেপ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, “একজন বিজেপি নেতা রাকেশ সিং সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের উদ্দেশে প্ররোচনামূলক স্লোগান দিচ্ছিলেন। রাকেশ সিং পশ্চিমবঙ্গের একজন দাগি আসামী। একটি মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত এবং হিংসা ছড়ানো নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ৫৯টি মামলা বকেয়া রয়েছে। তিনি নাড্ডার কনভয়ে কী করছিলেন? কেন নাড্ডা অপরাধী এবং সমাজবিরোধীদের সঙ্গে নিয়েছিলেন?”

নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করার জন্য হাজির ছিলেন খোদ ডিআইজি। পাশাপাশি ওই রাস্তা এবং ডায়মন্ড হারবারে আরও পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল বলেও স্বরাষ্ট্রসচিবকে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি তিনি জানান, “এই ঘটনায় তিনটি মামলা রুজু করা হয়েছে। একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে উস্থি থানার অন্তর্গত শিরাকল এলাকায় বিক্ষোভকারীদের প্ররোচনা দেওয়া রাকেশ সিং এবং অন্যান্যদের বিরুদ্ধে, দুটি মামলা রুজু করা হয়েছে ভাঙচুরের জন্য।”

বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডার কনভয়ে হামলার ঘটনাকে যে হাল্কাভাবে নেওযা হচ্ছে না, বৃহস্পতিবার রাতেই তা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শুক্রবার সকালে রাজ্যপালের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার কয়েকঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যের মুখ্যসচিব ও ডিজিকে ডেকে পাঠায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। ১৪ ডিসেম্বর তাঁদের দিল্লি আসতে বলা হয়।

দুদিনের রাজ্য সফরে বৃহস্পতিবার দ্বিতীয়দিনে নিউটাউন থেকে ডায়মন্ডহারবার যাচ্ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা। শিরাকোলে তাঁর কনভয়ে হামলা চালানো হয়। যদিও জেপি নাড্ডার কোনও আঘাত লাগেনি। তবে তাঁর সঙ্গে থাকা ওপর দুই নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয় এবং মুকুল রায় আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজেপি।

এদিকে, এই ঘটনার পরেই রাজ্য প্রশাআসনের দুই শীর্ষকর্তা মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি বীরেন্দ্রর থেকে রিপোর্ট তলব করেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনকর। সন্ধ্যা নাগাদ রাজভবনে পৌঁছান নবান্নের দুই শীর্ষ আমলা। যদিও বৈঠক শেষে অসন্তোষ প্রকাশ করে রাজ্যপাল টুইট করে জানান, হামলার ঘটনা নিয়ে বিশদে কোনও ব্যাখা দিতে পারেননি দুই আধিকারিক। শুক্রবার সকালে জেপি নাড্ডার ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে রিপোর্ট পাঠান রাজ্যপাল। যদিও রাজ্যের মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় গতকালই জানিয়ে দিয়েছেন, যেহেতু রাজ্য সরকার বিষয়টির তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, ফলে দিল্লি যাওয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়া হোক তাঁদের।

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles